তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ? ইখতিলাফ, সনদ ও ইমামগণের মাযহাব পর্যালোচনা :
প্রশ্ন : তারাবীহ এর সালাতের হুকুম কী? ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা (রহ.) এর বর্ণনামতে তারাবীহ কত রাকাত সাব্যস্ত? সনদের তাহকীক (বিশ্লেষণ) সহ জানাবেন!
উত্তর : তারাবীহ (تراويح) এর সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ তথা অনিবার্য সুন্নাহ। এটি গ্রহণযোগ্য কোনো ওজর ছাড়া ত্যাগ করা গুনাহ। রাসূল (সা.) থেকেও তারাবীহ পড়ার প্রমাণ রয়েছে। যদিও সেক্ষেত্রে রাকাত সংখ্যা সুনির্দিষ্ট ছিলনা, কখনো ১০ কখনো ১২ কখনো বা ২০ রাকাত (তবে ইবনু আব্বাস থেকে ২০ রাকাতের বর্ণনাটিতে একজন য’ঈফ রাবী রয়েছেন-লিখক)। নিচে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.) এর “আল হাভী লিল ফাতাওয়া” কিতাব থেকে তারাবীহ সংক্রান্ত একটি আলোচনা তুলে ধরছি-
وَفِي سُنَنِ الْبَيْهَقِيِّ وَغَيْرِهِ بِإِسْنَادٍ صَحِيحٍ عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ الصَّحَابِيِّ قَالَ: كَانُوا يَقُومُونَ عَلَىٰ عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَلَوْ كَانَ ذٰلِكَ عَلَىٰ عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَذَكَرَهُ؛ فَإِنَّهُ أَوْلَىٰ بِالْإِسْنَادِ وَأَقْوَىٰ فِي الِاحْتِجَاجِ.
الرَّابِعُ: أَنَّ الْعُلَمَاءَ اخْتَلَفُوا فِي عَدَدِهَا، وَلَوْ ثَبَتَ ذٰلِكَ مِنْ فِعْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يُخْتَلَفْ فِيهِ كَعَدَدِ الْوِتْرِ وَالرَّوَاتِبِ.
فَرُوِيَ عَنِ الْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّيهَا أَرْبَعِينَ رَكْعَةً غَيْرَ الْوِتْرِ، وَعَنْ مَالِكٍ: التَّرَاوِيحُ سِتٌّ وَثَلَاثُونَ رَكْعَةً غَيْرَ الْوِتْرِ؛ لِقَوْلِ نَافِعٍ: أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يَقُومُونَ رَمَضَانَ بِتِسْعٍ وَثَلَاثِينَ رَكْعَةً، يُوتِرُونَ مِنْهَا بِثَلَاثٍ. الْخَامِسُ: أَنَّهَا تُسْتَحَبُّ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ سِتًّا وَثَلَاثِينَ رَكْعَةً تَشْبِيهًا بِأَهْلِ مَكَّةَ، حَيْثُ كَانُوا يَطُوفُونَ بَيْنَ كُلِّ تَرْوِيحَتَيْنِ طَوَافًا وَيُصَلُّونَ رَكْعَتَيْهِ، وَلَا يَطُوفُونَ بَعْدَ الْخَامِسَةِ، فَأَرَادَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مُسَاوَاتَهُمْ فَجَعَلُوا مَكَانَ كُلِّ طَوَافٍ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ، وَلَوْ ثَبَتَ عَدَدُهَا بِالنَّصِّ لَمْ تَجُزِ الزِّيَادَةُ عَلَيْهِ.
বাংলা অনুবাদ : ইমাম বায়হাক্বীর সুনানসহ অন্যান্য গ্রন্থে সহীহ সনদে সাহাবী সাঈব ইবনু ইয়াযীদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে লোকেরা রমজান মাসে বিশ রাকাত (তারাবীহ) আদায় করতেন। যদি এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তবে তা অবশ্যই উল্লেখ করা হতো; কারণ তাঁর যুগের বর্ণনা সনদের দিক থেকে অধিক উপযুক্ত এবং দলীল হিসেবে অধিক শক্তিশালী। চতুর্থ প্রমাণ: আলেমগণ তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ করেছেন। যদি এটি নবী (সা.)-এর আমল হিসেবে নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হতো, তবে এতে মতভেদ হতো না— যেমন বিতর ও সুন্নাতে রাওয়াতিবের (নামাযের আগে-পরের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতগুলোকে ‘রাওয়াতিব’ বলা হয়) রাকাত সংখ্যায় মতভেদ নেই। বর্ণিত আছে, আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ (রহ.) বিতর ছাড়া চল্লিশ রাকাত পড়তেন। আর ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, বিতর ছাড়া তারাবীহ ছত্রিশ রাকাত। কারণ নাফি‘ (রহ.) বলেন: আমি লোকদের পেয়েছি, তারা রমজানে ঊনচল্লিশ রাকাত পড়তেন, যার মধ্যে তিন রাকাত ছিল বিতর। পঞ্চম প্রমাণ: মদিনাবাসীদের জন্য ছত্রিশ রাকাত মুস্তাহাব গণ্য করা হয়েছে— মক্কাবাসীদের অনুসরণে। কারণ মক্কার লোকেরা প্রতি দুই তারাবীহর মাঝে একটি করে তাওয়াফ করতেন এবং তার দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন; তবে পঞ্চম তারাবীহর পর তারা তাওয়াফ করতেন না। মদিনাবাসীরা তাদের সমতা রক্ষা করতে প্রত্যেক তাওয়াফের স্থলে চার রাকাত নামাজ নির্ধারণ করেন। যদি তারাবীহর রাকাত সংখ্যা কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট نص (দলীল) দ্বারা নির্ধারিত হতো, তবে তাতে বাড়ানো বৈধ হতো না। (আল হাভী লিল ফাতাওয়া, কিতাবুত সালাত অধ্যায় নং ৪০, ইমাম সুয়ূতী)।
ইমাম মালিক আর ইমাম বুখারীর তারাবীহ :
‘মুয়াত্তা মালিক’ আর ‘সহীহ বুখারী’ সহ নানা সোর্স থেকে কতেক সহীহ হাদীসের নামে যারা তারাবীহ আট (৮) রাকাত বলে দাবী করেন তারা ইমাম মালিক আর ইমাম বুখারী ‘তারাবীহ’ কত রাকাত পড়তেন সে বিষয়ে একটু খোঁজ নিতে পারেন। কারণ ইমাম মালিকের তারাবীহ বিতর সহ ২৩ থেকে ৩৯ রাকাত ছিল, মোটেও ৮ ছিল না। তেমনি ইমাম বুখারীর তারাবীহও ছিল ২০ রাকাত। তিনি তারাবীহ শেষ করে পৃথকভাবে ‘তাহাজ্জুদ’ পড়তেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানীর ”ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী” এর ১/৬৫৩ এর মুকাদ্দামাহ هدى السارى (হাদীউস সারী) অংশে এ কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) নিজ ‘সুনান’ গ্রন্থে ‘হাদীউস সারী’ কিতাবের উক্ত বর্ণনার সনদ (সূত্র) উল্লেখ করেছেন এবং টিকায় পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন যে, لَا بَأْسَ فِيهِ অর্থাৎ “এর সনদে কোনো সমস্যা নেই।” (শু’আবুল ঈমান লিল বায়হাক্বী, খ-৩, পৃ-৫২৪-৫২৫)।
ইমাম বুখারীর তারাবীহ সম্পর্কে :
“যখন রমাযানের প্রথম রাত আসতো তখন মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী (রহ.)-এর শিষ্যরা (ছাত্ররা) তাঁর কাছে একত্র হয়ে যেতো। তারপর তিনি তাদের নিয়ে (তারাবীহ) সালাত পড়তেন। প্রতি রাকাতে তিনি বিশ আয়াত তেলাওয়াত করতেন। আর এভাবে তিনি (কুরআন) খতম করতেন। আর যখন সাহরীর (তাহাজ্জুদের) সময় হয়ে যেত, তখন তিনি অর্ধেক থেকে কুরআনের একতৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করতেন। এভাবে সাহরীতে তিন দিনে (কুরআন) খতম করতেন।”
বলাবাহুল্য, বর্তমান যামানার কতিপয় সহীহ ডিলারদের মতো পূর্ববর্তী গবেষকগণ এখতিলাফি কোনো বিষয়ে একে অন্যকে আক্রমণ করে মত প্রকাশ করেননি, নিজের মতকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেননি। উম্মাহার মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করেননি। আলাদা মসজিদ নির্মাণ করতে তারা কাউকে কখনো উত্তেজিত করেননি, বরং তাঁরা প্রত্যেকে এধরণের এখতিলাফি বিষয়গুলোকে সীমিত কাঠামোর ভেতরে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চর্চা করে গেছেন। মজার ব্যাপার হল, নিজ নিজ মতভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে তারা সকলেই স্ব স্ব মাযহাবের প্রধান ইমামের মাযহাব (চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত/ফতুয়া) অনুসারেই আমল করে গেছেন।
প্রথমতঃ
ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা (রহ.) এর বর্ণনামতে তারাবীহ ২০ রাকাত পড়া সাব্যস্ত। ইমাম বুখারীর (জন্ম-মৃত্যু ১৯৪–২৫৬ হি.) সমসাময়িক বিখ্যাত হাফিযুল হাদীস হযরত আবূ বকর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শাইবাহ আল-আবসী আল-কূফী (রহ.) {জন্ম ১৫৯- মৃত্যু ২৩৫ হি.} হতে বর্ণিত, (তিনি বলেন)
حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ، عَنْ حَمَّادٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ
বাংলা অনুবাদ : ওয়াকী‘ আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আবু হানীফা থেকে, তিনি হাম্মাদ থেকে, তিনি ইবরাহীম (নাখঈ) থেকে বর্ণনা করেন যে—
“নিশ্চয়ই মানুষরা রমযান মাসে পাঁচ ‘তরওয়ীহা’ আদায় করত।”
(রেফারেন্স :- মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ, কিতাবুস সালাত, অধ্যায় কিয়ামু রমাযান ২য় খন্ড, হাদীস নম্বর ৭৬৯২)।
পাঁচ ‘তরওয়ীহা’ এর ব্যাখ্যা :
এক “তরওয়ীহা” বলতে চার রাকাতের পর বিশ্রামের অংশ বোঝানো হয়। অতএব, পাঁচ তরওয়ীহা = ৫ × ৪ = ২০ রাকাত।
সনদ বিশ্লেষণ :
১. وكيع بن الجراح (মৃ. ১৯৭ হি.) সম্পর্কে
ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, ثقة ثبت তথা নির্ভরযোগ্য ও সাব্যস্ত। ইমামু জারহু ওয়াত তা’দীল ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) বলেছেন, ثقة তথা নির্ভরযোগ্য। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে নির্ভরযোগ্য হাফিযুল হাদীস। হানাফী ফিকহের চল্লিশ সদস্যের হেভিওয়েট সদস্যের অন্যতম ফকীহ কেবিনেট।
২. أبو حنيفة النعمان (মৃ. ১৫০ হি.) সম্পর্কে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) বলেছেন, لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ তথা তাঁর বর্ণনায় কোনো সমস্যা নেই।
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন (রহ.) আরও বলেছেন,
ثِقَةٌ مَا سَمِعْتُ أَحَدًا ضَعَّفَهُ هَذَا شُعْبَةُ بْنُ الْحَجَّاجِ يَكْتُبُ إِلَيْهِ أَنْ يحدث ويأمره وَشعْبَة شُعْبَة
“তিনি একজন সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন বলে আমি শুনিনি। এ তো শু’বাহ ইবনুল হাজ্জাজ, তিনি আবূ হানীফাকে হাদীস বর্ণনা করতে লিখে পাঠান এবং অনুরোধ করেন। আর শু’বাহ তো শু’বাহ-ই।” (ইমাম ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিকা পৃ. ১২৭, সনদ সহীহ)।
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) আরও বলেন, ثِقَةٌ، لَا يُحَدِّثُ بِالْحَدِيثِ إِلَّا بِمَا يَحْفَظُهُ، وَلَا يُحَدِّثُ بِمَا لَا يَحْفَظُ. هٰكَذَا قَالَ يَحْيَى ابْنُ مَعِينٍ. سِيَرُ أَعْلَامِ النُّبَلَاءِ لِلذَّهَبِيِّ অর্থাৎ তিনি একজন সিকাহ (বিশ্বস্ত)। তিনি সেসব হাদীসই বর্ণনা করতেন যা তাঁর মুখস্ত আর তিনি সেসব হাদীস বর্ণনা করতেন না যা তিনি মুখস্ত রাখতেন না। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী ৬/৩৯৫)।
ইমাম মক্কি বিন ইবরাহীম (রহ.) বলেছেন, كَانَ أَبُو حَنِيفَةَ أَعْلَمَ أَهْلِ زَمَانِهِ অর্থাৎ আবু হানীফা তার সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন। (মানাকীবে ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম যাহাবী পৃ-৩২)।
ইমাম নাসাঈ (রহ.) বলেছেন, لَيْسَ بِالْقَوِيِّ فِي الْحَدِيثِ অর্থাৎ তিনি হাদীস বর্ণনায় শক্তিশালী নন।
ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেছেন, صَدُوقٌ فَقِيهٌ অর্থাৎ তিনি একজন সত্যবাদী ও ফকীহ (প্রাজ্ঞ)। তিনি ‘ফাতহুল বারী’ কিতাবে স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে ইমাম নাসাঈ’র মতটি তার একান্ত নিজেস্ব মত, এটিকে বাধ্যতামূলক মনে করা উচিত নয় আর এর দ্বারা আবূ হানীফার স্থায়ী মর্যাদা ও ন্যায়পরায়ণতাকে হ্রাস করতে দেয়াও ঠিক নয়।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন, النَّاسُ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ فِي الفِقْهِ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَفْقَهَ مِنْ أَبِي حَنِيفَةَ অর্থাৎ “মানুষ ফিকহে আবূ হানীফার উপর নির্ভরশীল। আমি আবূ হানীফা চেয়ে কাউকে অধিক শ্রেষ্ঠ ফকীহ দেখিনি।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৪, খতীবে বাগদাদী)। উদ্ধৃতিটি হাদীসের মতো সহীহ হিসবে গণ্য না হলেও, এটি ঐতিহাসিক মন্তব্য (اثر معتبر تاريخي) হিসেবে গ্রহণযোগ্য। পরবর্তী অনেক আলেম ও গবেষক এতে সালাফদের উচ্চ শ্রদ্ধা ও আবূ হানীফা (রহ.) এর জ্ঞান‑গুণ সম্পর্কে প্রতিপন্ন করেছেন।
ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, أَبُو حَنِيفَةَ ثِقَةٌ فِي عِلْمِهِ وَفَقِيهٌ অর্থাৎ “আবূ হানীফা তাঁর জ্ঞান ও ফিকহে বিশ্বাসযোগ্য।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৪-৭৫, খতীবে বাগদাদী)।
শিদ্দাদ ইবনু হাকিম (রহ.) বলেছেন, قَالَ شِدّادُ بْنُ حَكِيم مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَعْلَمَ مِنْ أَبِي حَنِيفَةَ অর্থাৎ “আমি কাউকে আবূ হানীফা‑র চেয়ে বেশি জ্ঞানী দেখিনি।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৩-৭৫, খতীবে বাগদাদী)।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন, إِنَّهُ كَانَ مِنَ العِلْمِ وَالوَرَعِ وَالزُّهْدِ وَإِيثَارِ الآخِرَةِ بِمَحَلٍّ لَا يُدْرِكُهُ أَحَدٌ، وَلَقَدْ ضُرِبَ بِالسِّياطِ لَيْلِيَّ القَضَاءِ فَلَمْ يَفْعَلْ অর্থাৎ “তিনি ছিলেন জ্ঞান, ধার্মিকতা, দুনিয়াবিমুখ এবং পরকালের লাভকে অগ্রাধিকার দানকারী হিসেবে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন যা কেউই লাভ করতে পারবে না। তাঁকে বিচারক পদে মনোনীত করতে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।” (হাশিয়ায়ে রদ্দুল মুহতার ১/৬৪, ইবনুল আবেদীন, মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা লিয-যাহাবী, পৃষ্ঠা ৪৩)।
ইমাম বুখারীর উস্তাদের উস্তাদ ইমাম ইবনুল মুবারক (রহ.) {জন্মমৃত্যু ১০২-১৮৯ হি.} বলেছেন, قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ عِنْدَنَا أَثَرٌ إِذَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ أَثَرٌ অর্থাৎ আবূ হানীফার বক্তব্য (রায়ের ক্ষেত্রে) হাদীসের মতো গ্রহণযোগ্য, যখন হাদীস না থাকবে। (মানাকিবুল ইমাম আবু হানীফা ওয়া আসহাবাইহি-২১১, ইমাম যাহাবী)।
ইমাম শু’বাহ (রহ.) বলেছেন, أَبُو حَنِيفَةَ ثِقَةٌ فِي فِقْهِ وَعِلْمِهِ অর্থাৎ “আবূ হানীফা তাঁর ফিকহ ও জ্ঞানে বিশ্বাসযোগ্য।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৪, বাগদাদী)।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন, إِنَّ أَبَا حَنِيفَةَ، وَإِنْ كَانَ النَّاسُ خَالَفُوهُ فِي أَشْيَاءَ، وَأَنْكَرُوهَا عَلَيْهِ، فَلَا يَسْتَرِيبُ أَحَدٌ فِي فِقْهِهِ وَفَهْمِهِ وَعِلْمِهِ، وَهُوَ مِنْ أَئِمَّةِ الْعُلَمَاءِ فِي الْفِقْهِ وَالرَّأْيِ وَالْإِجْمَاعِ عَلَى أَثَرِهِ অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আবু হানীফা যদিও মানুষ তাঁকে কিছু বিষয়ে বিরোধীতা করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে, তবু কেউ তাঁর ফিকহ, বুঝ এবং জ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ করতে পারে না। তিনি ফিকহ, রায় বিষয়ে বিজ্ঞ ইমামগণের অন্যতম। তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে।” (মিনহাজুস সুন্নাতুন নাবাবিয়্যাহ, শায়খ ইবনু তাইমিয়াহ-২/৬১৯)।
এভাবে আরও অসংখ্য তা’দীল রয়েছে ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহ.) সম্পর্কে।
৩. حماد بن أبي سليمان (মৃ. ১২০ হি.) সম্পর্কে ইমামগণ বলেছেন, ثقة فقيه তথা নির্ভরযোগ্য ও ফকীহ। তিনি হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রহ.) এর প্রধান শাগরেদ ও নির্ভরযোগ্য।
৪. إبراهيم النخعي (মৃ. ৯৬ হি.) তিনি একজন
كبار التابعين তথা প্রবীণ তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত। তিনি
সর্বসম্মতভাবে ثقة তথা নির্ভরযোগ্য। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) নিকট শৈশবে দ্বীন শিক্ষা করেছেন। তিনি অসংখ্য সাহাবীর কাছ থেকেও হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
সনদের সামগ্রিক মূল্যায়ন :
সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত)। এখানে কোনো মাতরূক বা মিথ্যুক রাবী নেই। তাই এই আসার/আছারটির সনদকে বলা যায়: حسن الإسناد (হাসানুল ইসনাদ) বা গ্রহণযোগ্য।
সমর্থনকারী দলীল :
ইবরাহীম নাখ’ঈ কুফার ফকীহ। কুফাবাসীদের আমল ২০ রাকাত ছিল—অন্যান্য আসারেও পাওয়া যায়। হযরত উমর (রা.)-এর যুগে তারাবীহ ২০ রাকাতের উপর সাহাবায়ে কেরামের ‘ইজমা’ (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বর্ণনা উক্ত আসারকে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী করে।
বর্ণনাটির ধরণ :
বিশিষ্ট তাবেয়ী, ফকীহ ও হাফিযুল হাদীস ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এর বর্ণিত রেওয়ায়েতটি ‘মাকতু’ তথা একজন তাবেয়ীর বক্তব্য। বলাবাহুল্য যে, বিশিষ্ট তাবেয়ী ও ফকীহ ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এর মাকতু পর্যায়ের রেওয়ায়েতটি দলীল প্রমাণ হিসেবে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। তার কারণ এই যে, তিনি এমন একজন মর্যাদাপ্রাপ্ত রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে মুহাদ্দিসগণের নিকট প্রসিদ্ধ যে, তিনি শুধু বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) রাবীদের কাছ থেকে রেওয়ায়েত নেন। ফলে তাঁর ‘তাদলীস’ (সনদের প্রচ্ছন্ন ত্রুটিসহ কৃত রেওয়ায়েত) বা ‘মুরসাল’ (সনদের শুরুর দিক থেকে সাহাবী বা তাবেয়ীর নাম বাদ দিয়ে রাসূল সা. থেকে সরাসরি কৃত রেওয়ায়েত) গ্রহণযোগ্য। এ সম্পর্কে ইমাম ইবনু আব্দিল বার মালেকী (রহ.) ‘আত তামহীদ’ কিতাবে লিখেছেন,
وَكُلُّ مَنْ عُرِفَ أَنَّهُ لَا يَأْخُذُ إِلَّا عَنْ ثِقَةٍ فَتَدْلِيسُهُ وَمُرْسَلُهُ مَقْبُولٌ فَمَرَاسِيلُ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ وَمُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ وَإِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ عِنْدَهُمْ صِحَاحٌ.
বাংলা অনুবাদ : প্রত্যেক ঐ রাবী যার সম্পর্কে এটা প্রসিদ্ধ যে, তিনি শুধু সিক্বাহ রাবীদের থেকেই রেওয়ায়েত নেন, তার তাদলীস এবং মুরসাল রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য। এজন্য সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শিরীন (রহ.) এবং ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এঁদের মুরসাল রেওয়ায়েত-সমূহ মুহাদ্দিসদের নিকট সহীহ। (আত-তামহীদ ১:৩০, ইমাম আবূ উমর ইবনে আব্দিল বার আল মালেকী রহঃ)।
দ্বিতীয়তঃ
ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহ.) এর ‘কিতাবুল আসার’ থেকে পূর্ণ সনদ সহ আরেকটি রেওয়ায়েত নিম্নরূপ, ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) বর্ণনা করেছেন,
أَبُو حَنِيفَةَ عَنْ حَمَّادٍ عَنْ إِبْرَاهِيمَ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ
বাংলা অনুবাদ : হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তিনি হযরত হাম্মাদ বিন আবু সুলাইমান থেকে, তিনি হযরত ইবরাহীম আন নাখ’ঈ তাবেয়ী (মৃত্যু-৯৬ হিজরী) থেকে, তিনি বলেছেন,
“নিশ্চয় লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়ীগণ) রমযান মাসে পাঁচ তারবীহার সাথে (অর্থাৎ বিশ রাকাত) তারাবীহ সালাত পড়তো।” (কিতাবুল আসার, ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বর্ণনাকৃত)। আরও দেখুন, আল মওসুআতুল হাদীসিয়্যাহ খন্ড ৯ পৃষ্ঠা ১০।
কিতাবুল আসার (كتاب الآثار) সম্পর্কে :
ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর অনবদ্য সংকলন কিতাবুল আসার/কিতাবুল আছার (كتاب الآثار) প্রসঙ্গে কিছু তথ্য পেশ করা হল,
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শায়খ ডক্টর খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) লিখেছেন, ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর যুগের আলিমগণ সাধারণত প্রচলিত পরিভাষায় গ্রন্থ রচনা করতেন না, বরং তাঁরা যা বলতেন তা ছাত্ররা লিখতেন। এজন্য তাবিয়ী যুগে বা ১৫০ হিজরী সালের মধ্যে মৃত্যুবরণকারী আলিমদের লেখা বা সংকলিত পৃথক গ্রন্থাদির সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের ছাত্রগণের লেখায় তাঁদের বক্তব্য সংকলিত। কখনো কোনো ছাত্র তাঁদের বক্তব্য একক পুস্তিকায় সংকলন করতেন। কখনো তাঁরা নিজেরাই কিছু তথ্য সংকলন করতেন। ইমাম আবূ হানীফার লেখা বলতে কখনো তাঁর নিজের সংকলন এবং কখনো তাঁর কোনো ছাত্র কর্তৃক তাঁর বক্তব্য বা তাঁর বর্ণিত হাদীস সংকলন বুঝানো হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই তা ‘ইমাম আবূ হানীফা’-র নামে প্রচারিত হতে পারে। এ মূলনীতির ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফা রচিত ও সংকলিত প্রধান গ্রন্থ ‘কিতাবুল আসার’।
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘আসার’ (الآثار) বলতে সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীগণের বক্তব্য বা কর্ম বুঝানো হয়। সাধারণভাবে ‘আসার’ এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় হিজরী শতকে মুহাদ্দিসগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের সাথে সাহাবীগণের বক্তব্যও সংকলন করতেন এবং ফিকহী পদ্ধতিতে বিন্যাস করতেন। এরূপ গ্রন্থগুলো ‘মুআত্তা’, ‘মুসান্নাফ’ বা ‘কিতাবুল আসার’ নামে পরিচিত।
ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত ‘কিতাবুল আসার’ তাঁর কয়েকজন ছাত্র বর্ণনা করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: যুফার ইবন হুযাইল (১৫৮ হি.), আবূ ইউসুফ (১৮২ হি.), মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (১৮৯ হি.), হাসান ইবন যিয়াদ লুলুয়ী (২০৪ হি.)। তন্মধ্যে আবূ ই্উসূফ এবং মুহাম্মাদ বর্ণিত ‘কিতাবুল আসার’ দুটো পৃথক গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত। এ গ্রন্থদুটোতে ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ ইমাম আবূ হানীফা বর্ণিত হাদীসে নববী এবং সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্য সংকলন করেছেন। উল্লেখ্য যে, উভয় গ্রন্থের অধিকাংশ ‘আসার’ বা হাদীস একই। মূলত গ্রন্থদুটো ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত কিতাবুল আসারের পৃথক বর্ণনা মাত্র। ইমাম মালিকের মুআত্তা গ্রন্থটি যেমন বিভিন্ন ছাত্র বিভিন্ন সময়ে শ্রবণ ও বর্ণনা করার কারণে অনেকগুলো মুআত্তার সৃষ্টি হয়েছে। অনুরূপভাবে ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত কিতাবুল আসার ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম আবূ ইউসুফ পৃথকভাবে বর্ণনা করার কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়েছে।
‘কিতাবুল আসার’ (كتاب الآثار) ছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত হাদীসগুলো ‘মুসনাদে আবী হানীফা’ নামে বর্ণিত ও গ্রন্থায়িত। তাঁর কয়েকজন ছাত্র তাঁর মুসনাদ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:
১. ইমাম আবূ হানীফার পুত্র হাম্মাদ ইবন আবূ হানীফা (১৮০ হি.)
২. মুহাম্মাদ ইবন খালিদ ওয়াহবী (২০০ হি.)
৩. আবূ আলী হাসান ইবন যিয়াদ লু’লুয়ী (২০৪ হি.)
চতুর্থ হিজরী শতক থেকে ষষ্ঠ হিজরী শতক পর্যন্ত সময়ে কয়েকজন মুহাদ্দিস ইমাম আবূ হানীফার সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলো তাঁদের সনদে সংগ্রহ করে ‘মুসনাদ আবী হানীফা’ নামে সংকলন করেন। তাঁদের অন্যতম,
(১) উমার ইবনুল হাসান ইবনুল আশনানী বাগদাদী (৩৩৯ হি.)
(২) আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকূব ইবনুল হারিস আল-হারিসী আল-বুখারী আল-উসতাদ (৩৪০ হি.)
(৩) আবূ আহমদ আব্দুল্লাহ ইবন আদী জুরজানী (৩৬৫ হি.)
(৪) আবুল কাসিম তালহা ইবন মুহাম্মাদ ইবন জা’ফার মুআদ্দিল শাহিদ বাগদাদী (৩৮০ হি.)
(৫) আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফ্ফার ইবন মূসা ইবন ঈসা ইবন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৩৭৯ হি.)
(৬) আবূ নুআইম ইসপাহানী আহমদ ইবন আব্দুল্লাহ (৪৩০ হি.)
(৭) আবূ বকর আহমদ ইবন মুহাম্মাদ কালায়ী কুরতুবী (৪৩২ হি.)
(৮) আবূ বাকর মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল বাকী ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আনসারী খাযরাজী (৫৩৫ হি.)
(৯) আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ ইবন খসরু বালখী বাগদাদী (৫২৬ হি.)
(১০) আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবিল আওয়াম সা’দী।
তিনি মিসরের বিচারপতি ছিলেন। তাঁর মৃত্যু তারিখ জানা যায় না। তবে তিনি ইমাম নাসায়ীর (৩০৩ হি.) ছাত্র ছিলেন (সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৪/১২৭, ইমাম যাহাবী)। এছাড়া তাঁর পৌত্র মিসরের বিচারপতি আহমদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আবিল আওয়াম হিজরী ৩৪৯ সালে জন্মগ্রহণ এবং ৪১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এ হিসেবে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি চতুর্থ হিজরী শতকের প্রথমার্ধে ৩৩০-৩৪০ হিজরী সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। (তারাজিমুল হানাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৪৯-১৫০ ইমাম তকি উদ্দীন ইবনে আব্দিল কাদির আত তামিমি আল গায্যী (মৃত. ১০১০ হি.); তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১০৬-১০৭ ইমাম আবুল ওয়াফা আল কারশী (৬৯৬-৭৭৫ হি.); আল-আ’লাম ১/২১১, ইমাম খায়রুদ্দীন আয যিরকলী আল দামেস্কী মৃত. ১৩৯৬ হি.)।
এগুলোর মধ্যে আবূ মুহাম্মাদ হারিসী সংকলিত মুসনাদ এবং আবূ নুআইম ইস্পাহানি সংকলিত মুসনাদ গ্রন্থ দুটি মুদ্রিত।
সপ্তম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ইমাম আবুল মুআইয়িদ মুহাম্মাদ ইবন মাহমূদ খাওয়ারিযমী (৬৬৫ হি.) ‘জামিউল মাসানীদ’ বা ‘মুসনাদগুলোর সংকলন’ নামক একটি গ্রন্থে ‘মুসনাদ আবী হানীফা’ নামে প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান হাদীসগুলো একত্রে সংকলন করেন।
সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ইসলামী শরীয়ত তারাবীহকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে বিবেচনা করে। আর বিশিষ্ট ফকীহ ও তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখ’ঈ’র কথাটি সাহাবীদের যুগে মুসলমানগণ তারাবীহ বিশ (২০) রাকাত পড়তেন বলেই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করে। কাজেই আট (৮) রাকাত সম্পর্কিত রেওয়ায়েতগুলো হতে ‘তারাবীহ’ উদ্দেশ্য হবেনা, বরং ‘তাহাজ্জুদ’ উদ্দেশ্য। কেননা ঐ সকল রেওয়ায়েতের মধ্যে উক্ত আট রাকাত রমাযান এবং রমাযানের বাহিরেও পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অথচ রমাযানের বাহিরে শুধু ‘তাহাজ্জুদ’ থাকতে পারে কিন্তু ‘তারাবীহ’ নয়। আর যারা উক্ত আট রাকাতকেই ‘তারাবীহ’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তাদের মতে ‘তারাবীহ’ নামে স্বতন্ত্র কোনো সালাত নেই। তাদের মতে তারাবীহ আর তাহাজ্জুদ দুটো একই সালাত। কিন্তু এ লোকগুলোকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, ‘তাহাজ্জুদ’ কি ইশার সালাতের পরেই পড়া যাবে? তখন আর তাদের কোনো উত্তর থাকেনা।
চলবে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্টিকেল। সাহাবায়ে কেরামগণের সর্বসম্মত আমল অনুসারে তারাবীহ কত রাকাত? | তারাবীহ আট রাকাত পড়লে সুন্নাহ আদায় হবে কি? | তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ? | মুয়াত্তা মালিক গ্রন্থের আট রাকাত কিয়ামুল লাইলের জবাব
লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ